''আত্ম-বিশ্লেষণ''- একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযাত্রা
''আত্ম-বিশ্লেষণ''- একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযাত্রা
আমরা প্রত্যেকটা মানুষ ই প্রতিদিন নতুন নতুন অনেক কিছু জানছি, দেখছি, শিখছি। যে আচরণগুলো ছোট বেলায় করতে অভ্যস্ত ছিলাম কিংবা করতে অনুপ্রেরণা পেয়েছি সেই রকম অনেক আচরণ কিন্তু আমরা চট করে বদলাতে পারি না। যেমন একটা ছেলে হয়ত খুব জেদি, তার জেদের জন্য পরিবারের সবাইকে খুব তটস্থ থাকতে হয়। পরবর্তীতে সে যদি এটা বদলাতে চায় তখন এটা প্রকাশের ভঙ্গি বদলানো যাবে কিন্তু আচরণটা বা ঐ তীব্র অনুভূতিটা থেকে যায়। তবে সবার ক্ষেত্রে নয়। অনেকের ক্ষেত্রে হয়ত অনুভূতিটাও পরিবর্তিত হতে পারে। আমাদের আচরণের ব্যাখ্যা দেয়ার জন্য Transactional Analysis ( এটাকে Transcriptional Analysis বললে বেশী ভাল হত) অনেক অভিনব একটি থিওরি। আমাদের জীবনের যে Script বা অনুলেখনী নিয়ে আমরা চলছি তা মূলত ছোটবেলাতেই গঠন হয়ে যায়। এটা অনেকটা জিনগত গঠনের মত। আমাদের জিনমগুলো যেমন কোষের বিন্যাসের সাথে সাথে কার শারীরিক বৈশিষ্ট্য কেমন হবে তা প্রকাশ করে তেমনি ব্যক্তিত্বের ধরণ কার কেমন হবে তা ঐ Script এর মাধ্যমে শৈশবেই গঠিত হয়ে যায়।
যদি কোন ব্যক্তির শৈশবকালকে বিশ্লেষণ করা যায় তাহলে ঐ ব্যক্তির বর্তমান আচরণ ও অনুভুতির উৎস সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া সম্ভব। আমার মতে কগনিটিভ থেরাপি এর স্কিমা (Schema বা ছাঁচ) এর সাথে এই স্ক্রিপ্ট এর একটা সামঞ্জস্য আছে। সেটা হল দুইটাই baseline বা প্রাথমিক মানসিক স্তর গঠন করে থাকে। তবে স্কিমা পরিবর্তনশীল। যদি সেখানে অন্য আরেকটা স্কিমা বা ধারণা বা ছাঁচ যাই বলি না কেন গ্রহণযোগ্যতা পায় তাহলে স্কিমা পাল্টে গিয়ে নতুন ভাবে তৈরি হয়। কিন্তু লাইফ স্ক্রিপ্ট এর বদলে যেহেতু আরেকটা স্ক্রিপ্ট বসানো সম্ভব নয় তাই একে manage বা ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জীবনকে এগিয়ে নিতে হয়। লাইফ স্ক্রিপ্ট এর সাথে অনুভূতি গুলো ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একজন মানুষের ছোটবেলার কষ্টের বা আনন্দের অনুভূতিগুলোর সমষ্টিই তাকে তার স্ক্রিপ্ট গঠনে সাহায্য করে থাকে। এই থিওরিতে বেশ কিছু ড্রাইভ বা মনস্তাত্ত্বিক প্রণোদনার উল্লেখ রয়েছে। যা শৈশবের কার্যকর শিক্ষণ থেকেই তৈরি হয়ে থাকে। উদাহরণস্বরূপ আমার কথা যদি বলি, শৈশবে খুব তাড়াতাড়ি কোন কাজ শেষ করার জন্য আমার বাবা আমাকে তাগিদ দিতেন। আর দেরি হলেই বলতেন 'জলদি/quick/hurry-up' । তো এখনও পর্যন্ত আমি যেটা উপলব্ধি করি যে অনেক কিছু বদলে গেছে, সময়, বয়স, স্থান কিন্তু আজো আমার মধ্যে ঐ hurry-up drive বা দ্রুত করার যে মনস্তাত্ত্বিক প্রণোদনা সেটা রয়ে গেছে। আমাদের অনেকের মধ্যে এক বা একাধিক এই ড্রাইভগুলো থাকতে পারে।
মজার ব্যাপার হল এই ছোট ছোট বিশ্লেষণগুলো অনেক উপভোগ্য হবে যদি আমরা সেটা সহনীয় করতে পারি এবং ক্ষতির চাইতে উপকারের পরিমাণ বাড়ানো যায়। অর্থাৎ মানুষ হিসেবে এই শৈশবের অর্জনগুলো কতটা কাজে লাগাতে পারছি বা নিয়ন্ত্রিত থাকছি সেটা গুরুত্বপূর্ণ। তাই মানুষকে বিশ্লেষণ যেমন কঠিন তেমনি এটি একটি দুঃসাহসিক অভিযাত্রার মত। এখন প্রশ্ন হচ্ছে কখন এই বিশ্লেষণ জরুরি হয়ে পড়ে। আমরা যখন মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে বা দিয়ে থাকি তখন কিন্তু শুধুমাত্র অসুবিধাগুলো নিয়ে আলোচনা হয় না। আমাদের কাজটা আরো গভীরে হয়ে থাকে। যেটা তে এই থিওরিগুলো সহায়ক ভূমিকা পালন করে। আমরা তখন নিজকে এবং নিজের শৈশবকে খুব গুরুত্ব দেই। কারণ তখন শৈশবের পরিবেশ, আচরণ, অনুভূতি এসব বিশ্লেষণ খুব জরুরি। এভাবে ব্যক্তি নিজেই নিজের সম্পর্কে আর স্পষ্ট ও সম্যক ধারণা লাভ করতে পারে। তাই সমস্যায় পরার আগেই আত্ম-বিশ্লেষণ জরুরি।
যখন কেউ তার নিজের বোধশক্তি, অভ্যন্তরের মনস্তাত্ত্বিক খুঁটিনাটি নাড়তে শুরু করে , সেখান থেকেই তার নতুন একটা অভিযাত্রা শুরু হয়। যা তার নিজস্ব সত্ত্বা আর জগতকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। আর তখন সে ধীরে ধীরে নিজের অনুভূতির উৎস খুঁজে পেতে থাকে এবং নিজের আশেপাশের প্রকৃতি ও পরিবেশের সাথে তাল মিলিয়ে অর্থপূর্ণ পদচারণার সুত্রপাত ঘটায়। যখন ব্যক্তি তার ভিতরে গড়ে উঠা আরেকটা গাঠনিক জগতের সন্ধান পায় তখন তার নিজের সব আচরণ, চিন্তা ও অনুভূতি গুলোর ব্যাখ্যা তৈরি হয়। ফলে ব্যক্তি কোন অনুভূতিটাকে কোন আচরণের সাথে প্রকাশ করবে বা সংযোগ দিবে সেটা বুঝতে পারে।
এভাবে মানসিক স্বাস্থ্য সেবকরা সহযোগিতা করে থাকেন যেন কোন ব্যক্তি তার আচরণ, চিন্তা ও অনুভূতির ব্যাবহার অর্থপূর্ণ ভাবে করতে পারেন। পাশাপাশি ব্যক্তির অভিজ্ঞতা, অর্জন, ও মানবীয় গুণাবলির যথাযথ প্রয়োগে তারা সহযোগিতা করে থাকেন। (এটি বলার প্রয়োজন ছিল কারন মানসিক স্বাস্থ্য নেয়ার ব্যাপারে এখনও অনেক ভুল ধারণা রয়েছে।)
অর্থাৎ সহজ অর্থে বলা যায় যে, অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ একই সুত্রে গাঁথা। অতীতের অর্থাৎ শৈশবের মনস্তাত্ত্বিক গঠনের পরিচয় যেমন বর্তমানকে সাবলীল ও কর্মমুখর করতে পারে, তেমনি ভবিষ্যতের জন্য এটি একটি প্রস্তুতিও বলা চলে। আগামী দিনের ভবিষ্যৎ যাই হোক না কেন, এই পরিক্রমায় আত্ম বিশ্লেষণের মাধ্যমে ব্যক্তি তার আত্ম-পরিচয়, আত্ম-উপলব্ধি ও মনস্তাত্ত্বিক আত্ম-ধারণা নিয়ে সামনে অগ্রসর হওয়ার দৃঢ় মনবল অর্জনের শক্তি ও সামর্থ্য লাভ করে।
-লেখা
শাম্মী আক্তার
(মনোবিদ)
বিঃদ্রঃ (উপরের বিশ্লেষণগুলো থিওরির থেকে নেয়া হলেও বক্তব্যে লেখক তার নিজের মতামত উপস্থাপন করেছেন, কারো যদি এই বিশ্লেষণের সাথে দ্বিমত থাকে তবে সেটা অবশ্যই প্রশংসনীয়। ভিন্ন মতামত থাকাটা খুব-ই স্বাভাবিক। যদি আলোচনায় কোথাও ভুল আছে বলে মনে হচ্ছে তাহলে সংশোধন এর জন্য অনুরোধ জানানো হচ্ছে।)

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন